বাউল গান ও শত শত বিচ্ছিদি গানের শ্রষ্ঠা শাহ্ আব্দুল করিম
নিউজ ডেস্ক:
গাড়ি চলেনা,বন্দে মায়া লাগাইছে
এমন শত শত বিচ্ছিদি গানের শ্রষ্ঠা শাহ্ আব্দুল করিম। শুধু কি বিচ্ছিদি গান তাঁর কন্ঠে
ধারণ করেছে রাধা রমন,হাসন রাজা,পল্লীগিতী,ভাটিয়ারী,ভাওয়াইয়া সহ মাটি ও মানুষের গান।
হ্নদয়ে বাউল সম্রাট লালন
শাহ্ পুনজো শাহের দর্শনকে লালন করতেন শাহ্ আব্দুল করিম। গেয়েছেন শরীয়তী,মারফতী,সহ হাজারও
গান, দেড় শতাধিকেরও গান লেখালেখির পাশাপাশি সুরও দিয়েছেন এই বাউল সম্রাট।
ভাটি অঞ্চলের মানুষের জন্য
তৈরী সে সব গান গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন,কালের অনেক শিল্পী । শাহ্ আব্দুল করিমের
গান এখনও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। গাড়ি চলেনা,বন্দে মায়া লাগাইছে,আগে কি সুন্দর
দিন কাটাইতাম গানগুলো এখনও অনেক জনপ্রিয়।
বাউল গানের শ্রষ্ঠা শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫
ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই
থানার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
দারিদ্র ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া বাউল শাহ আবদুল করিমের
সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। বাউল সম্রাটের প্রেরণা তার স্ত্রী
আফতাবুন্নেসা। তিনি তাকে আদর করে ডাকতেন ‘সরলা’। তাঁর একমাত্র ছেলে শাহ নূর জালাল।
ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল
অন্যায়,অবিচার,কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। তিনি তার গানের
অনুপ্রেরনা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে।
যদিও দারিদ্র তাকে বাধ্য করে কৃষিকাজে তার শ্রম ব্যায় করতে কিন্তু কোন কিছু তাকে
গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি আধ্যাত্নিক ও বাউল গানের দীক্ষা লাভ
করেছেন কামাল উদ্দীন, সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ
ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে। তিনি শরীয়তী, মারফতি, নবুয়ত,
বেলায়া সহ সবধরনের বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।
বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৬টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে।
বইগুলো হলো- আফতাব সংগীত, গণ সংগীত, কালনীর ঢেউ, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে এবং
দোলমেলা। সম্প্রতি সিলেট জেলা মিলনায়তনে তাঁর রচনাসমগ্র (অমনিবাস)-এর মোড়ক
উন্মোচিত হয়েছে।
সারাজীবন দেশের মানুষকে গান দিয়ে আনন্দ দিয়েছেন, বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে উদ্ধুদ্ধও
করেছেন। কিন্তু জীবিত থাকতে স্বীকৃতি পাননি সে তুলনায় খুব একটা। তবে জীবনের
শেষদিকে এসে চারদিক থেকেই অনেক স্বীকৃতি পেতে থাকেন। ২০০১ সালে রাষ্ট্রের দ্বিতীয়
সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পান। এরপর পান মেরিল প্রথম আলো আজীবন
সম্মাননা। তার ১০টি গান বাংলা অ্যাকাডেমি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে। বাংলাদেশ ও
ভারতের অসংখ্য শিল্পী তার গান গাইতে থাকেন সর্বত্র। ফলে মৃত্যুর আগেই করিম হয়ে
ওঠেন দুই বাংলার লোকগানের এক স্বর্গীয় যাদুকর। তাকে নিয়ে নির্মাতা শাকুর মজিদ তৈরি
করেন 'ভাটির পুরুষ' নামের প্রামাণ্যচিত্র। রঙের মানুষ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি
হয়। তার জীবনে নিয়ে তৈরি মঞ্চনাটক 'মহাজনের নাও' এ পর্যন্ত প্রায় ১০০টি প্রদর্শনী
করে ফেলেছে।
২০০৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর বাউল
সম্রাট শাহ আবদুল করিম সিলেটের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
আজ হয়তো সু-সম্রাট শাহ্ আব্দুল
করিম নেই কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে ভক্ত হ্নদয়ের যুগের পর যুগ অমর হয়ে থাকবেন মাটি
ও মানুষের এই শিল্পী।

No comments